২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি আজ ১১ জুন ২০২৬ বৃহস্পতিবার রাতে এক বিবৃতিতে বলেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট কথার ফুলঝুরি, রাজনৈতিক চমকবাজী ছাড়া আর কিছুই নয়। বজেটের আকার বড় দেখানোর জন্য ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা অবাস্তব এবং কোনভাবেই অর্জনযোগ্য নয়।


জাসদের বিবৃতিতে বলা হয়, মেটিক্যুলাস ডিজাইনে জঙ্গীবাদী উত্থান ও আক্রমণ চালিয়ে রেজিম চেইঞ্জ অপারেশনের মধ্য দিয়ে আমেরিকার তাবেদার ড. ইউনুস সরকারের ক্ষমতা দখল এবং ১৮ মাসের মবের শাসন দেশের রাষ্ট্র-প্রশাসন-রাজনীতি- অর্থনীতি-সমাজে যে গভীর ও সর্বগ্রাসী সংকট তৈরী করেছে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির একতরফা ও আসন ভাগাভাগির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত ‘আমরা ও মামু’দের সংসদ ও সরকার সেই গভীর সংকট থেকে জাতিকে পুনরুদ্ধারে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ এখনও গ্রহণ করতে পারেনি। বরং বিএনপি সরকার ড. ইউনুসের মবের শাসন, মগের মুল্লুকের ধারাবাহিকতাই বজায় রেখেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত আনতে পরেনি। আইনের শাসন ও সুশাসনের অনুপস্থিতির কারণে দেশীয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগ করার বদলে তাদের পুরাতন শিল্প-কল-কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে। রপ্তানি ও আমদানি হ্রাস পাওয়ায় রাজস্ব আদায় মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই—আগস্টে জঙ্গীবাদী হামলায় বিপর্যস্ত প্রশাসনের অংশ হিসাবে রাজস্ব প্রশাসনও বিপর্যস্থ হয়েছে। এই বিপর্যস্ত রাজস্ব প্রশাসন দিয়ে রাজস্ব আদায়ের প্রাক্কলিত ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা আকাশ কুসুম কল্পনা মাত্র।
জাসদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাজেট শুধু অংক ও পরিসংখ্যানের বিষয় না। বাজেটের পিছনে রাজনৈতিক দর্শন থাকে। ‘বাজেট কল্যান রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করবে’ বলে সরকার গালভরা বুলি দিয়েছে। ইউরোপীয় কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণার ভিত্তিই হচ্ছে উদার গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ, অন্তর্ভূক্তি সুশাসন, আইনের শাসন। অথচ ২০২৪ এর জুলাই-আগস্ট থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যেই উদার গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র-সমাজ-রাজনীতি, সুশাসন ও আইনের শাসনকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
জাসদের বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। এখন সকলেই স্বীকার করছেন যে, ২০২৬ সালের একতরফা নির্বাচন এবং রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রেখে দেশে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়।
জাসদের বিবৃতিতে বলা হয়, ২ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি রেখে যে বাজেট প্রাক্কলন করা হয়েছে এবং ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণ ও দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণের যে আশা করা হয়েছে তা জাতীয় অর্থনীতিকে আত্মনির্ভরতার পথ থেকে আবার পরনির্ভরতা ও ঋণগ্রস্থতার দিকে নিয়ে যাবে। দেশীয় ব্যাংকের উপর সরকারি ঋণের চাপ ব্যাংকিং খাতকে রক্তশুন্য করে ফেলবে। ব্যাংকের রক্তশূন্যতা ও সংকুচিত অবস্থা উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়ে দেবে।
জাসদের বিবৃতিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে ৬০টি নিত্যপণ্যের উৎস কর কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাবে সরকারের নিত্যপণ্যের দাম কমানোর সদিচ্ছা থাকলেও সিন্ডিকেট দমনে ব্যর্থতা এবং সুশাসন ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতি সরকারের এই সদিচ্ছাকে মূল্যহীন করে দিবে।
জাসদের বিবৃতিতে বলা হয়, বাজেট প্রস্তাবে বর্তমান মূল্যস্ফীতি হার ৯.৪২% থেকে কমিয়ে ৭.৫% করার যে ইচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে সেই ইচ্ছাও মার খাবে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত বাজারে নিত্যপণ্যের দামের অযৌক্তিক ও লাগামহীন উর্ধ্বগতি এবং জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে শিল্প ও কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, সরকারের প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহে ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ, নতুন টাকা ছাপানো এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ার কারণে।
জাসদের বিবৃতিতে বলা হয়, বাজেটে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেটাও অবাস্তব। কারণ বিগত অর্থবছরের বাজেট নির্ধারিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৫.৫ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব হয় নাই।
জাসদের বিবৃতিতে বলা হয়, কাগজ আমদানির উপর শুল্ক বৃদ্ধি শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকাশনা শিল্পের উপর বড় আঘাত হানবে, বৈদুতিক মটর বিলাস দ্রব্য না, বৈদ্যুতিক মটরের উপর আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি বহুদিক দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জাসদের বিবৃতিতে বলা হয়, বাজেটে মোবাইল ফোনের উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পে ভ্যাট প্রত্যাহারের সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখা, মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পে ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানির উপর কর কমিয়ে আনা; কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনারের উপর শর্তসাপেক্ষ কর কমিয়ে আনা, মোবাইল সিমের উপর ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব সাধুবাদ যোগ্য।
জাসদের বিবৃতিতে, সরকারকে আকাশে না উড়ে মাটিতে নেমে বাস্তববাদী হবার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, গত ২৩ মাসের অদক্ষ, অযোগ্য ও মবের শাসনে বিপর্যস্থ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করার দিকে নজর দেয়া উচিত। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বাজেট বাস্তবায়ন তো দূরের কথা সাধারণ স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, উৎপাদন বজায় রাখাই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে দাঁড়াবে।
বার্তা প্রেরক
সাজ্জাদ হোসেন
দফতর সম্পাদক, জাসদ